ছোট গল্প : ২০২১ সালে বাংলাদেশ
২০২১ সাল ডিজিটাল বাংলাদেশ, দেশ তথ্য প্রযুক্তি খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। সবার হাতে হাতে ট্র্যান্সপারেন্ট স্ম্যার্টফোন। দেশের ২০ কোটি জনগণ সোস্যাল মিডিয়ায় সম্পৃক্ত। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাজারে এনেছে এক নতুন এক ধরনের চশমা, সবার চোখে চোখে সেই চশমা। চশমার উপরের অংশে টিভি ডিসপ্লে, নিচের অংশ ফাকা। ডিসপ্লেতে সর্বদা ক্রিকেট খেলা দেখা যাচ্ছে, জনগণ সেটা উপভোগ করছে, আর প্রয়োজনে নিচের অংশ কাজে লাগাচ্ছে। চাকুরী-বাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য সব চলছে সেই চশমা পরেই।
শিমুল অনুপম, বয়স ৪০। আজকে হঠাৎ করেই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুখ শান্তির কথা চিন্তা করছিলো। ভাবছিলো আজ থেকে ৫ বছর আগেও এত সুখ-শান্তি ছিলো না, কিন্তু দেশে সবার মাঝে আজ কতই না আনন্দ, কতই না সম্প্রীতি।
শিমুল অনুমপের মনে পড়ে, আজ থেকে মাত্র ৫ বছর আগেও বাংলাদেশে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ছিলো ইসলাম। তখন অনেক কাজই সে করতে পারতো না। কিন্তু ২০১৬ এর মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ শব্দটি তুলে দেওয়া হয় (দেখতে পারেন: https://goo.gl/CL0jwE)। সংবিধানকে করা হয় একচেটিয়া সেক্যুলার, সেই থেকে দেশে সর্বময় সমতা বিরাজ করছে।
এই তো আজ থেকে ৪ বছর আগেও তার নাম ছিলো সাইদ হাসান। কিন্তু সংবিধান সেক্যুলার তাই নতুন আইন হয়ে গেলো- যেহেতু সংবিধান সেক্যুলার, তাই দেশে এমন কোন নাম রাখা যাবে না, যে নাম দিয়ে কারো ধর্ম বোঝা যায়, এতে সেক্যুলার সংবিধান ক্ষুন্ন হবে, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে। কর্তৃপক্ষ মাত্র ১ মাসের আলটিমেটাম দেয় সবার নাম পরিবর্তন করার জন্য। স্পষ্ট করে বলে দেয়- আরবী নাম রাখা যাবে না কিংবা এমন নাম রাখা যাবে না, যে নাম দিয়ে বোঝা যায় আপনি ‘মুসলমান’।
শিমুল তাই নিজ পরিবারের সকল সদস্যের নাম পরিবর্তন করে ফেলেছে। এর জন্য অবশ্য বেশি কষ্ট করতে হয়নি। ডিজিটাল যুগ, ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইডির নাম পরিবর্তন করা সম্ভব।
যেমন- শিমুলের ওয়াইফের আগের নাম ছিলো জান্নাত, নতুন নাম করা হয়েছে অপ্সরী। ছেলের নাম ছিলো নূর, নুতন নাম হয়েছে প্রদীপ, মেয়ের নাম ছিলো সুফিয়া, নতুন নাম দেয়া হয়েছে লক্ষী। কর্তৃপক্ষ এখন খুব কড়াকড়ি, কারো নাম সেক্যুলার না করলে ৭ বছরের জেল নিশ্চিত।
শিমুলের মনে পড়ে, আজ থেকে ৫ বছর আগেও ঢাকা শহরকে ডাকা হতো মসজিদের শহর বলে। তবে পরিবর্তনটা হয়ে গেছে RANDOM, এখন মসজিদ বলে দেশে আর কিছুই নেই, সব হয়ে গেছে উপাসনালয়। সংবিধান পরিবর্তন হওয়ার পর অনেক সংখ্যালঘু অভিযোগ করে- “কোন প্রতিষ্ঠানের উপরে যদি মসজিদ শব্দটি ঝুলানো থাকে তবে তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে, এছাড়া মসজিদ শব্দটাও আরবী। তাই উপসনালয় শব্দটাই যুক্তিযুক্ত।”
তাছাড়া উপসনালয়গুলো কেন ধর্ম ভিত্তিক হবে ? একটি প্রতিষ্ঠান থাকবে কিন্তু সেখানে সবাই প্রবেশ করতে পারবে না, এটা তো সংবিধানের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করার সামিল। তাই উপসনালয়গুলোকেও হতে হবে সেক্যুলার। সেখানে প্রত্যেকে গিয়ে নিজ নিজ ঈশ্বরের প্রার্থনা করতে পারবে, এতে কোন বাধা থাকবে না।
তাই বর্তমানে ঢাকা শহরের এক সময়কার মসজিদগুলো শুধু নামই পরিবর্তন করেনি, বরং সেখানে প্রবেশ করেছে গৌতম বুদ্ধ, যিশু আর দূর্গা-গনেশের মূর্তি। এ উপাসনালয়গুলোতে সবাই যে যার মত ঈশ্বরের প্রার্থনা করতে পারছে, এতে কোন ধরা বাধা থাকছে না।
শিমুল ভেবে খুব আনন্দিত হয়। সংবিধান থেকে ‘ইসলাম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার পর দেশে কতই না সুবিধা হয়েছে। এই তো সেদিন বাসে একটা মুসলমান ধরলাম। ‘মুসলমান’ শব্দটি বলা হলো, এ কারণে যে- বর্তমানে মুসলমান শব্দটা একটা গালির মত, আতঙ্কের নাম। যেমন আজ থেকে ১০০ বছর আগে মুসলমানরা নামের শেষে জঙ্গী শব্দটা ব্যবহার করতো গৌরব হিসেবে, কিন্তু ১০ বছর আগে সেই জঙ্গী শব্দটা দিয়ে প্র্যাকটিসিং মুসলমানদের নাজেহাল করার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু এখন শুধু জঙ্গী নয় ‘মুসলমান’ শব্দটাই আতঙ্কের নাম। সংবিধান পরিবর্তনের পর সবাই নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থী বা সেক্যুলার বলেই পরিচয় দেয়। তাই কাউকে যদি নাজেহাল করতে হয়, তখন বলতে হয়- “ঐ ধর ধর, মুসলমান যাচ্ছে।” ব্যস সে দেয় দৌড়।
ঐ ছেলেটির সাথে শিমুলের ছিলো ব্যক্তি শত্রুতা । বাসে তাকে দেখতেই মনে হলো ওকে ফাসিয়ে দিলে কেমন হয়। ব্যস শিমুল চিৎকার শুরু করলো- “ঐ ঐ মুসলমান, ধর ধর”। ব্যাস ! বাসের সবাই গিয়ে তার কলার ধরে বললো- “কিরে তুই কি মুসলমান”। সে বললো- মিথ্যা কথা, আমি মুসলমান না।”
শিমুল বললো- আমি রামের দিব্যি খেয়ে বলছি, ও মিথ্যা বলছে, ও ঠিক ঠিক মুসলমান। ঠিক আছে, যদি সত্যিই প্রমাণ করতে চাও, তবে প্যান্ট খুলে দেখা তোমার শিশ্ন।”
ছেলেটি প্রাণ বাচাতে সবার স্যামনে কষ্ট করে টেনে টুনে জিন্স খুলে, অ্যান্ডারওয়্যার খুলে সবাইকে দেখিয়ে দেয় তার আগার চামড়া এখনও অক্ষত রয়েছে।” তার এতদূর প্রমাণ দেখে সেইদিনের মত সবাই তাকে ছেড়ে দেয়।
আসলে সত্যিই বলতে ঐ ছেলেটি আগে মুসলমানই ছিলো। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন হওয়ার পর সবাই মুসলমান ট্যাগ খেতে পারে, আইনী ঝামেলায় পড়তে পারে, কিংবা শত্রুদের খপ্পরে পড়তে পারে এই ভয়ে অনেকেই প্ল্যাস্টিক সার্জারি করে আগার চামড়া পুনরায় সংযুক্ত করে নিয়েছে, আগে তো জান বাচাতে হবে, কি বলেন ?
হ্যা এখন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সারকামসিশন বা খৎনা করা আইন করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাতির এক অংশের শিশ্নের আগা কাটা থাকবে, আরেক অংশের থাকবে না, এটা জাতির মধ্যে শিশ্নদ্বন্দ্ব তৈরী করতে পারে, সেক্যুলার সংবিধান তা গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবিধান পরিবর্তনের পর থেকে থেকে হালাল ফুড পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়েছে। একই সাথে এমন কোন পণ্য বা মাংশ বিক্রি নিষিদ্ধ হয়েছে যা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে। বাজারে এখন গরুর কসাইখানাগুলো পরিবর্তিত হয়ে শুকরখানা হয়ে গেছে, এবং সবাইকে সেক্যুলার প্রমাণের জন্য বাধ্যতামূলক শুকর খাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ কেউ যদি ধর্মের দোহাই দিয়ে শুকর না খায়, তবে বুঝতে হবে সে এখনও প্রকৃতঅর্থে বাংলাদেশের সংবিধান মানতে পারেনি। শুকর না খেলে প্রমাণ হচ্ছে সে অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহী, আর রাষ্ট্রদ্রোহীর শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড।
ইতিমধ্যে দেশে আইন করে গরুকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে এবং গরু গত্যা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। এছাড়া মতিঝিলে শাপলা চত্বরে শাপলা ফুল সরিয়ে এক বিশাল গো মূর্তি বসানো হয়েছে। ঐ চত্বর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক হাত জোড় গোমাতার আশির্বাদ প্রার্থনা করতে হয়, মতিঝিল চত্বরের চর্তুপাশে সংযুক্ত করা হয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির সিসিটিভি। কেউ যদি ভুল করেও হাত জোড় না করে, তবে তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ দ্বারা চিহ্বিত গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর গো-মাতা অবমাননার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
শিমুলের মনে খুশি খুশি লাগে, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম তুলে দেওয়ার ফলে কত ভালোই না হয়েছে। দেশে এখন ধর্মীয় পোষাক বলতে কিছু নেই। বাংলাদেশের মেয়েরা এখন মুক্তবিহঙ্গ, সবাইকে আগা-গোড়া দেখা যায়। হিজাব-বোরকা-নেকাব পুরোপুরি নিষিদ্ধ। শুধু বাইরে নয়, ঘরেও নিষিদ্ধ। কর্তৃপক্ষ আইন করে দিয়েছে প্রত্যেকের ঘরে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি বসাতে হবে, ঘরের মধ্যে কেউ এমন কোন কাজ করলো যেটা সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধচারণ, তবে সংবিধান লঙ্ঘরের অপরাধে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তবে এটা খুব ভালো হয়েছে, সবার কপালে তিলক আকা বাধ্যতামূলক করা হয়ছে, এটা বাঙালীয়ানার প্রতীক। এটার পাশাপাশি নারীরা কপালে সিদুর ব্যবহার করলে তাদের জন্য আলাদাভাবে সরকারিভাবে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, ফলে সবাই ভাতার লোভে সিদুর ব্যবহার শুরু করেছে। দেশে আরবীয় পোষাক (টুপি, জুব্বা, সালোয়ার) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়েছে। বর্বরদের পোষাক বাংলাদেশীরা কখনও পড়তে পারে না। একই সাথে নিষিদ্ধ হয়েছে দাড়ি রাখা।
এর বদলে দেশীয় পোষাক- যেমন ধূতি, এক ছাটের পাঞ্জাবী, গেরুয়া কালারের চাদরকে জাতীয় পোষাক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ভাবতে ভালো লাগে, এখন দেশের সকল উৎসবই সার্বজনীন হয়ে গেছে। শিমুলের অসস্তি লাগে, কিছুদিন আগেও দেশে এমন সব উৎসব ছিলো যেগুলোতে ধর্মীয় গন্ধ ছিলো। সে সকল অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদেরকে ধর্মীয়ভাবে হেয় করা হতো। কিন্তু এখন সে সব সাম্প্রদায়িক দিবস পালন নিষিদ্ধ হয়েছে, এর মধ্যে আছে- ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর। এর বদলে বাঙালীর জাতীয় উৎসবসমূহ (যেমন-পহেলা বৈশাখ, সার্বজনিন দুর্গা উৎসব, সার্বজনিন স্বরসতী উৎসব, সার্বজনিন হোলি, সার্বজানিন দিপাবলী ইত্যাদি) রাষ্ট্রে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সত্যিই বলতে এ সব অনুষ্ঠানে অনেক আনন্দ হয়, নারী-পুরুষ মিলে একটা আলাদা চেতনা জাগ্রত হয়, যেটা আগেরকার সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানগুলোতে সম্ভব ছিলো না।
সংবিধান পরিবর্তন হয়েছে ৫ বছর, দেশের প্রশাসনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন আর আগেরমত রাষ্ট্রীয় উপরের পদগুলো মুসলমানদের দখলে নেই। এখন সবার সমান অধিকার। এখন বাধ্যতামূলক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি এবং সেনাপ্রধান এই তিনটি পদ তিনটি ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে আগত হতে হবে, একচেটিয়া কোন বিশেষ ধর্মের হতে পারবে না।
তবে শিমুলের একটি কথা মনে করে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। এখন কেন যেন নিজেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক বলে মনে তার। পাকিস্তান প্রিয়ডে যেমন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিহারীরা বেশি সুযোগ সুবিধা পেতো, আমেরিকায় যেমন ইহুদীরা সংখ্যালঘু হয়েও বেশি সুযোগ পায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুরা প্রথম শ্রেনীর নাগরিক হয়ে গেছে। নতুন সেক্যুলার সংবিধানের উপর ভিত্তি করে তাদের জন্য নতুন আইন করে অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই প্রশাসন-চাকুরী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথমে সংখ্যালঘুরা ঢুকবে, এরপর যদি কিছু সুযোগ থাকে তবে সেখানে বাকিরা ঢুকবে। এর ফলে সংখ্যালঘুরা হয়েছে গেছে দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, আর সংখ্যাগুরুরা হয়ে গেছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। এক্ষেত্রে অবশ্য আন্দোলন-ফান্দোলনের কোন অপশন নেই। কারণ দেশের সংবিধান এখন সেক্যুলার, তাই কেউ বৈষ্যমের বিরুদ্ধে বললেই তাকে মুসলমান হিসেবে ট্যাগ দিয়ে গ্রেফতার করে ডিম্বথেরাপী দেওয়া হয়, তাই সবাই বিনা বাক্যে পুরো বিষয়টি মেনে নিয়েছে।
তারপরও অবশ্য বাংলাদেশীরা সুখী। কারণ গত বছরই বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেটে চাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক একটি খেলা মানে এক একটি স্বপ্ন, এক একটি দিগ্বীজয়। তারা বিশেষ প্রযুক্তির চশমা পরে (উপরে ডিসপ্লে, নিচে ফাকা) রাত দিন পার করে। তাই শিমুলদের আর কোন দুঃখ নেই, নেই চাওয়া কিংবা পাওয়া।
“হে ক্রিকেট তুমি বাংলাদেশীদের করিয়াছো মহান, দিয়েছো দিগ্বিজয়ীর সম্মান”।
লেখাটি পড়তে পারবেন আমার ব্লগে- http://goo.gl/Aclkhq
শিমুল অনুপম, বয়স ৪০। আজকে হঠাৎ করেই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুখ শান্তির কথা চিন্তা করছিলো। ভাবছিলো আজ থেকে ৫ বছর আগেও এত সুখ-শান্তি ছিলো না, কিন্তু দেশে সবার মাঝে আজ কতই না আনন্দ, কতই না সম্প্রীতি।
শিমুল অনুমপের মনে পড়ে, আজ থেকে মাত্র ৫ বছর আগেও বাংলাদেশে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ছিলো ইসলাম। তখন অনেক কাজই সে করতে পারতো না। কিন্তু ২০১৬ এর মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ শব্দটি তুলে দেওয়া হয় (দেখতে পারেন: https://goo.gl/CL0jwE)। সংবিধানকে করা হয় একচেটিয়া সেক্যুলার, সেই থেকে দেশে সর্বময় সমতা বিরাজ করছে।
এই তো আজ থেকে ৪ বছর আগেও তার নাম ছিলো সাইদ হাসান। কিন্তু সংবিধান সেক্যুলার তাই নতুন আইন হয়ে গেলো- যেহেতু সংবিধান সেক্যুলার, তাই দেশে এমন কোন নাম রাখা যাবে না, যে নাম দিয়ে কারো ধর্ম বোঝা যায়, এতে সেক্যুলার সংবিধান ক্ষুন্ন হবে, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে। কর্তৃপক্ষ মাত্র ১ মাসের আলটিমেটাম দেয় সবার নাম পরিবর্তন করার জন্য। স্পষ্ট করে বলে দেয়- আরবী নাম রাখা যাবে না কিংবা এমন নাম রাখা যাবে না, যে নাম দিয়ে বোঝা যায় আপনি ‘মুসলমান’।
শিমুল তাই নিজ পরিবারের সকল সদস্যের নাম পরিবর্তন করে ফেলেছে। এর জন্য অবশ্য বেশি কষ্ট করতে হয়নি। ডিজিটাল যুগ, ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইডির নাম পরিবর্তন করা সম্ভব।
যেমন- শিমুলের ওয়াইফের আগের নাম ছিলো জান্নাত, নতুন নাম করা হয়েছে অপ্সরী। ছেলের নাম ছিলো নূর, নুতন নাম হয়েছে প্রদীপ, মেয়ের নাম ছিলো সুফিয়া, নতুন নাম দেয়া হয়েছে লক্ষী। কর্তৃপক্ষ এখন খুব কড়াকড়ি, কারো নাম সেক্যুলার না করলে ৭ বছরের জেল নিশ্চিত।
শিমুলের মনে পড়ে, আজ থেকে ৫ বছর আগেও ঢাকা শহরকে ডাকা হতো মসজিদের শহর বলে। তবে পরিবর্তনটা হয়ে গেছে RANDOM, এখন মসজিদ বলে দেশে আর কিছুই নেই, সব হয়ে গেছে উপাসনালয়। সংবিধান পরিবর্তন হওয়ার পর অনেক সংখ্যালঘু অভিযোগ করে- “কোন প্রতিষ্ঠানের উপরে যদি মসজিদ শব্দটি ঝুলানো থাকে তবে তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে, এছাড়া মসজিদ শব্দটাও আরবী। তাই উপসনালয় শব্দটাই যুক্তিযুক্ত।”
তাছাড়া উপসনালয়গুলো কেন ধর্ম ভিত্তিক হবে ? একটি প্রতিষ্ঠান থাকবে কিন্তু সেখানে সবাই প্রবেশ করতে পারবে না, এটা তো সংবিধানের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করার সামিল। তাই উপসনালয়গুলোকেও হতে হবে সেক্যুলার। সেখানে প্রত্যেকে গিয়ে নিজ নিজ ঈশ্বরের প্রার্থনা করতে পারবে, এতে কোন বাধা থাকবে না।
তাই বর্তমানে ঢাকা শহরের এক সময়কার মসজিদগুলো শুধু নামই পরিবর্তন করেনি, বরং সেখানে প্রবেশ করেছে গৌতম বুদ্ধ, যিশু আর দূর্গা-গনেশের মূর্তি। এ উপাসনালয়গুলোতে সবাই যে যার মত ঈশ্বরের প্রার্থনা করতে পারছে, এতে কোন ধরা বাধা থাকছে না।
শিমুল ভেবে খুব আনন্দিত হয়। সংবিধান থেকে ‘ইসলাম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার পর দেশে কতই না সুবিধা হয়েছে। এই তো সেদিন বাসে একটা মুসলমান ধরলাম। ‘মুসলমান’ শব্দটি বলা হলো, এ কারণে যে- বর্তমানে মুসলমান শব্দটা একটা গালির মত, আতঙ্কের নাম। যেমন আজ থেকে ১০০ বছর আগে মুসলমানরা নামের শেষে জঙ্গী শব্দটা ব্যবহার করতো গৌরব হিসেবে, কিন্তু ১০ বছর আগে সেই জঙ্গী শব্দটা দিয়ে প্র্যাকটিসিং মুসলমানদের নাজেহাল করার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু এখন শুধু জঙ্গী নয় ‘মুসলমান’ শব্দটাই আতঙ্কের নাম। সংবিধান পরিবর্তনের পর সবাই নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থী বা সেক্যুলার বলেই পরিচয় দেয়। তাই কাউকে যদি নাজেহাল করতে হয়, তখন বলতে হয়- “ঐ ধর ধর, মুসলমান যাচ্ছে।” ব্যস সে দেয় দৌড়।
ঐ ছেলেটির সাথে শিমুলের ছিলো ব্যক্তি শত্রুতা । বাসে তাকে দেখতেই মনে হলো ওকে ফাসিয়ে দিলে কেমন হয়। ব্যস শিমুল চিৎকার শুরু করলো- “ঐ ঐ মুসলমান, ধর ধর”। ব্যাস ! বাসের সবাই গিয়ে তার কলার ধরে বললো- “কিরে তুই কি মুসলমান”। সে বললো- মিথ্যা কথা, আমি মুসলমান না।”
শিমুল বললো- আমি রামের দিব্যি খেয়ে বলছি, ও মিথ্যা বলছে, ও ঠিক ঠিক মুসলমান। ঠিক আছে, যদি সত্যিই প্রমাণ করতে চাও, তবে প্যান্ট খুলে দেখা তোমার শিশ্ন।”
ছেলেটি প্রাণ বাচাতে সবার স্যামনে কষ্ট করে টেনে টুনে জিন্স খুলে, অ্যান্ডারওয়্যার খুলে সবাইকে দেখিয়ে দেয় তার আগার চামড়া এখনও অক্ষত রয়েছে।” তার এতদূর প্রমাণ দেখে সেইদিনের মত সবাই তাকে ছেড়ে দেয়।
আসলে সত্যিই বলতে ঐ ছেলেটি আগে মুসলমানই ছিলো। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন হওয়ার পর সবাই মুসলমান ট্যাগ খেতে পারে, আইনী ঝামেলায় পড়তে পারে, কিংবা শত্রুদের খপ্পরে পড়তে পারে এই ভয়ে অনেকেই প্ল্যাস্টিক সার্জারি করে আগার চামড়া পুনরায় সংযুক্ত করে নিয়েছে, আগে তো জান বাচাতে হবে, কি বলেন ?
হ্যা এখন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সারকামসিশন বা খৎনা করা আইন করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাতির এক অংশের শিশ্নের আগা কাটা থাকবে, আরেক অংশের থাকবে না, এটা জাতির মধ্যে শিশ্নদ্বন্দ্ব তৈরী করতে পারে, সেক্যুলার সংবিধান তা গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবিধান পরিবর্তনের পর থেকে থেকে হালাল ফুড পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়েছে। একই সাথে এমন কোন পণ্য বা মাংশ বিক্রি নিষিদ্ধ হয়েছে যা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে। বাজারে এখন গরুর কসাইখানাগুলো পরিবর্তিত হয়ে শুকরখানা হয়ে গেছে, এবং সবাইকে সেক্যুলার প্রমাণের জন্য বাধ্যতামূলক শুকর খাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ কেউ যদি ধর্মের দোহাই দিয়ে শুকর না খায়, তবে বুঝতে হবে সে এখনও প্রকৃতঅর্থে বাংলাদেশের সংবিধান মানতে পারেনি। শুকর না খেলে প্রমাণ হচ্ছে সে অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহী, আর রাষ্ট্রদ্রোহীর শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড।
ইতিমধ্যে দেশে আইন করে গরুকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে এবং গরু গত্যা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। এছাড়া মতিঝিলে শাপলা চত্বরে শাপলা ফুল সরিয়ে এক বিশাল গো মূর্তি বসানো হয়েছে। ঐ চত্বর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক হাত জোড় গোমাতার আশির্বাদ প্রার্থনা করতে হয়, মতিঝিল চত্বরের চর্তুপাশে সংযুক্ত করা হয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির সিসিটিভি। কেউ যদি ভুল করেও হাত জোড় না করে, তবে তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ দ্বারা চিহ্বিত গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর গো-মাতা অবমাননার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
শিমুলের মনে খুশি খুশি লাগে, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম তুলে দেওয়ার ফলে কত ভালোই না হয়েছে। দেশে এখন ধর্মীয় পোষাক বলতে কিছু নেই। বাংলাদেশের মেয়েরা এখন মুক্তবিহঙ্গ, সবাইকে আগা-গোড়া দেখা যায়। হিজাব-বোরকা-নেকাব পুরোপুরি নিষিদ্ধ। শুধু বাইরে নয়, ঘরেও নিষিদ্ধ। কর্তৃপক্ষ আইন করে দিয়েছে প্রত্যেকের ঘরে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি বসাতে হবে, ঘরের মধ্যে কেউ এমন কোন কাজ করলো যেটা সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধচারণ, তবে সংবিধান লঙ্ঘরের অপরাধে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তবে এটা খুব ভালো হয়েছে, সবার কপালে তিলক আকা বাধ্যতামূলক করা হয়ছে, এটা বাঙালীয়ানার প্রতীক। এটার পাশাপাশি নারীরা কপালে সিদুর ব্যবহার করলে তাদের জন্য আলাদাভাবে সরকারিভাবে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, ফলে সবাই ভাতার লোভে সিদুর ব্যবহার শুরু করেছে। দেশে আরবীয় পোষাক (টুপি, জুব্বা, সালোয়ার) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়েছে। বর্বরদের পোষাক বাংলাদেশীরা কখনও পড়তে পারে না। একই সাথে নিষিদ্ধ হয়েছে দাড়ি রাখা।
এর বদলে দেশীয় পোষাক- যেমন ধূতি, এক ছাটের পাঞ্জাবী, গেরুয়া কালারের চাদরকে জাতীয় পোষাক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ভাবতে ভালো লাগে, এখন দেশের সকল উৎসবই সার্বজনীন হয়ে গেছে। শিমুলের অসস্তি লাগে, কিছুদিন আগেও দেশে এমন সব উৎসব ছিলো যেগুলোতে ধর্মীয় গন্ধ ছিলো। সে সকল অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদেরকে ধর্মীয়ভাবে হেয় করা হতো। কিন্তু এখন সে সব সাম্প্রদায়িক দিবস পালন নিষিদ্ধ হয়েছে, এর মধ্যে আছে- ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর। এর বদলে বাঙালীর জাতীয় উৎসবসমূহ (যেমন-পহেলা বৈশাখ, সার্বজনিন দুর্গা উৎসব, সার্বজনিন স্বরসতী উৎসব, সার্বজনিন হোলি, সার্বজানিন দিপাবলী ইত্যাদি) রাষ্ট্রে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সত্যিই বলতে এ সব অনুষ্ঠানে অনেক আনন্দ হয়, নারী-পুরুষ মিলে একটা আলাদা চেতনা জাগ্রত হয়, যেটা আগেরকার সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানগুলোতে সম্ভব ছিলো না।
সংবিধান পরিবর্তন হয়েছে ৫ বছর, দেশের প্রশাসনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন আর আগেরমত রাষ্ট্রীয় উপরের পদগুলো মুসলমানদের দখলে নেই। এখন সবার সমান অধিকার। এখন বাধ্যতামূলক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি এবং সেনাপ্রধান এই তিনটি পদ তিনটি ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে আগত হতে হবে, একচেটিয়া কোন বিশেষ ধর্মের হতে পারবে না।
তবে শিমুলের একটি কথা মনে করে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। এখন কেন যেন নিজেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক বলে মনে তার। পাকিস্তান প্রিয়ডে যেমন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিহারীরা বেশি সুযোগ সুবিধা পেতো, আমেরিকায় যেমন ইহুদীরা সংখ্যালঘু হয়েও বেশি সুযোগ পায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুরা প্রথম শ্রেনীর নাগরিক হয়ে গেছে। নতুন সেক্যুলার সংবিধানের উপর ভিত্তি করে তাদের জন্য নতুন আইন করে অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই প্রশাসন-চাকুরী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথমে সংখ্যালঘুরা ঢুকবে, এরপর যদি কিছু সুযোগ থাকে তবে সেখানে বাকিরা ঢুকবে। এর ফলে সংখ্যালঘুরা হয়েছে গেছে দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, আর সংখ্যাগুরুরা হয়ে গেছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। এক্ষেত্রে অবশ্য আন্দোলন-ফান্দোলনের কোন অপশন নেই। কারণ দেশের সংবিধান এখন সেক্যুলার, তাই কেউ বৈষ্যমের বিরুদ্ধে বললেই তাকে মুসলমান হিসেবে ট্যাগ দিয়ে গ্রেফতার করে ডিম্বথেরাপী দেওয়া হয়, তাই সবাই বিনা বাক্যে পুরো বিষয়টি মেনে নিয়েছে।
তারপরও অবশ্য বাংলাদেশীরা সুখী। কারণ গত বছরই বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেটে চাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক একটি খেলা মানে এক একটি স্বপ্ন, এক একটি দিগ্বীজয়। তারা বিশেষ প্রযুক্তির চশমা পরে (উপরে ডিসপ্লে, নিচে ফাকা) রাত দিন পার করে। তাই শিমুলদের আর কোন দুঃখ নেই, নেই চাওয়া কিংবা পাওয়া।
“হে ক্রিকেট তুমি বাংলাদেশীদের করিয়াছো মহান, দিয়েছো দিগ্বিজয়ীর সম্মান”।
লেখাটি পড়তে পারবেন আমার ব্লগে- http://goo.gl/Aclkhq

No comments