
সে বলেছে- “আখ চাষকে আমি নিরুৎসাহিত করছি এবং দেশ থেকে আখ চাষ ধীরে ধীরে উঠিয়ে দেওয়া হবে। দেশের বাজারে চিনির দাম ৪৫ টাকা কেজি। আর আমদানি করা চিনির দাম ২০-২৫ টাকা কেজি। ১৫টি চিনিকলের কারণে দেশের ক্ষতি হচ্ছে। আখ মাড়াইয়ে সময় লাগে আট মাস, বাকি সময় কারখানাগুলো বন্ধ থাকে। চিনি নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ নেই।”
(সূত্র : প্রথম আলো, লিঙ্ক-http://goo.gl/NhR2b6)
তারমানে বাংলাদেশের পুরো চিনি সেক্টরকে আমদানি নির্ভর করতে চাইছে অর্থমন্ত্রী। আর সেটা করলে বিদেশ থেকে আমদানি করা যাবে প্রচুর চিনি, আর যত বেশি আমদানি, ততবেশি কমিশন জমবে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত একাউন্টে।
আসুন এবার কিছু চিনি বিশ্লেষণ করি-
১) বাংলাদেশে মোট আখ চাষী সংখ্যা ৮ লক্ষ। এছাড়া ১৫ চিনি কলে নিয়োজিত শ্রমিক সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার। চাষীসহ পুরো শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ১০ লক্ষ। দেশে আখ চাষ বন্ধ হলে এই ১০ লক্ষ কর্মঠ মানুষ বেকার হবে। এক জনের পরিবারে জনসংখ্যা ৫ জন করে হলে, সোজা ভাষায় ৫০ লক্ষ মানুষের পেটে লাথি মারতে বললো অর্থমন্ত্রী।
২) সরকার বিদেশ থেকে চিনি আমদানি করার পক্ষপাতি। অথচ বিদেশে থেকে যে সাদা ধবধবে চিনি আমদানি করা হচ্ছে তা মারাত্মক বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক। যা ক্যান্সার হওয়ার অন্যতম কারণ। অপরদিকে বাংলাদেশের লালচে চিনি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। (http://goo.gl/7s21wB, http://goo.gl/wfNCUH)
৩) বাংলাদেশের লালচে চিনিতে ১ চামচে যে মিষ্টি হয়, বিদেশী চিনির ৩ চামচে সে মিষ্টি হয় না। সে হিসেবে বিদেশী চিনি ২৫ টাকা, বাংলাদেশী চিনি ৪৫ টাকা তো কমই আছে।
৪) চিনি সেক্টরকে বার বার বলা হচ্ছে লোকসান সেক্টর। লোকশানের অন্যতম কারণ-
ক) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের অভাবে জমিতে কম আখ চাষ হচ্ছে। ফলে আখের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
খ) এছাড়া আখ উৎপাদন কম হওয়ায় চিনি কলগুলো ৪ মাস মাড়াই চলছে এবং বাকি ৮ মাস শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে।
বিষয়টা অনেকটা মাথা ব্যাথ্যা হলে পুরো মাথা কেটে ফেলার মত অবস্থা। ত্রুটির অংশ না সেরে অর্থমন্ত্রী পুরো আখ চাষকেই বন্ধ করে দিতে চাইছে। অথচ- বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু আখ চাষের জন্য বেশ উপযোগী৷ উপযুক্ত অসুবিধা কাটিয়ে উঠে আধুনিক তথা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষ করলে এদেশে প্রতি হেক্টরে ১৩৫-১৩৬ টন আখ অনায়াসেই উৎপাদন হতে পারে (বর্তমানে হচ্ছে ১৯ টন)৷ সে হিসেবে ০.৪৩ মিলিয়ন একর জমিতে ২ কোটি ৩৫ লক্ষ টন আখ উদপাদন করা সম্ভব। যেখান থেকে উৎপাদিত হবে ১৬ লক্ষ ৪৫ হাজার টন চিনি ( এক টন আখে হয় ০.০৭ টন চিনি) । এতে দেশের মোট চাহিদা (১৪ লক্ষ টন) তো মিটবেই, বরং বিদেশে ২ লক্ষ টন চিনি রফতানি করা সম্ভব (http://goo.gl/oGGHhw, https://goo.gl/nscGTI) ।
আর স্বাভাবিকভাবে আখ উৎপাদন বাড়লে সারা বছর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ব্যস্ত থাকবে চিনি কলগুলো। তখন লস হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং আরো কয়েক কোটি লোকের এ সেক্টরে কর্মস্থানের ব্যবস্থা হবে। সে হিসেবে এই সংকটের জন্য দায়ি সরকারের সদিচ্ছার অভাব। কিন্তু সরকার সদিচ্ছা না দেখিয়ে উল্টো পুরো সেক্টরকে বন্ধ করে দিতে চাইছে, যা সত্যিই হতাশাজনক।
যে যাই বলুক বাংলাদেশের মূল জীবন ‘কৃষিতে। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে কৃষিকে বাচাতে হবে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের জীবন অর্থাৎ কৃষিকেই বিলুপ্ত করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। এর আগে জুটমিলগুলো বন্ধ করে “সোনালি আশের দেশ বাংলাদেশ” এই বাক্য ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। আর এখন নতুন করে দেশের অন্যতম খাদ্যশস্য ‘আখ উৎপাদন না করতে’ ডাইরেক্ট সরকারি ঘোষনা দেওয়া হচ্ছে। এটা সত্যিই ন্যাক্কারজনক ও স্পষ্ট বিদেশী দালালি ছাড়া কিছু না।
যে অথর্ব মন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারে, তার অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করাই শ্রেয়।
No comments