পূজায় সরকারি অনুদানের আড়াই কোটি টাকা ট্রাস্টিদের পকেটে
দুর্গাপূজায় সরকারি অনুদানের দুই কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। মন্দির নির্মাণ ও মেরামতের জন্য দেয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের এই টাকা বিতরণ না করে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের অনেকে ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এমন তথ্য। উল্লিখিত অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক)। ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
অডিট আপত্তি ও অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব ও যুগ্মসচিব শংকর চন্দ্র বসু বলেন, আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। ট্রাস্টিরা ওই টাকা বিতরণ করেছে বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবে যেসব ভাউচার তারা দিয়েছেন তা ‘আসল’ কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সারা দেশের মন্দির মেরামত ও নির্মাণের জন্য প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী বিশেষ অনুদান দিয়ে থাকেন। আগে এ টাকা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মাধ্যমে বিতরণ করা হতো। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে এই অর্থ তাদের মাধ্যমেই বিতরণ করা হয়। একজন ভাইস চেয়ারম্যানসহ ২২ জন ট্রাস্টি নিয়ে এ ট্রাস্ট গঠিত।
হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এদের প্রত্যেকের নামে প্রতিবছর ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই টাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার মন্দির নির্মাণ ও মেরামতসহ শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্দির/পূজা কমিটির নামে অর্থ বিতরণ করার কথা।
অভিযোগ উঠেছে, ট্রাস্টিদের মধ্যে ৪/৫ জন ছাড়া প্রায় সবাই ২০-২৫ হাজার টাকা বিতরণ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন। বিতরণের সময় উৎকোচও নেন অনেকে।
সম্প্রতি ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালের সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দুই কোটি ৬৫ লাখ ৬০ হাজার ৪০০ টাকা আপত্তি পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের টাকা ট্রাস্টিদের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রদান কোনোভাবেই আর্থিক শৃংখলার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, বিতরণ করা অর্থের সমন্বয় ভাউচার, প্রাপ্তিস্বীকার ও জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যয়নসহ পরবর্তী নিরীক্ষায় উপস্থাপন করা প্রয়োজন। নইলে উল্লিখিত অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া প্রয়োজন।
ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে মন্তব্য করে প্রতিবেদনে বলা হয়- ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ এই তিন বছরের হিসাব অডিটকালে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের অর্থমন্দির/ পূজামণ্ডপভিত্তিক বরাদ্দ না দিয়ে ট্রাস্টিদের দেয়া হয়েছে। ট্রাস্টিদের গৃহীত অর্থ সমন্বয় করা হয়নি। বিতরণকারীর স্বাক্ষর ব্যতীত পূজামণ্ডপের সিল ছাড়াই টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রাপ্তি স্বীকারপত্র নেয়া হয়নি।
অডিট প্রতিবেদনে ২০১২ সালে দুর্গাপূজার ৮৪ লাখ ৩১ হাজার ৪০০ টাকা ১৬ জন ট্রাস্টির ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসেবে পাঠানো হয়েছে। ২০১৩ সালের ৮৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং ২০১৪ সালের ১৮ জন ট্রাস্টির নামে ৯৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের বৃহত্তর রাজশাহীর ট্রাস্টি তপন কুমার সেনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনেছেন নাটোর পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সরকার অসীম কুমার। তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্ত চেয়ে অভিযোগ করেছেন। গত ১৯ এপ্রিল দুদক থেকে জানানো হয়েছে তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সরকার অসীম কুমার বলেন, গত ৬ বছর ধরে তপন কুমার এভাবে মন্দিরের অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করছেন। শুধু তিনি নন ৪/৫ জন ছাড়া অধিকাংশ ট্রাস্টিই এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তারা যে ভাউচার দিয়েছে এবং যেসব মন্দিরে টাকা বিতরণের কথা বলেছে সেখানে সরেজমিন তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়বে।
খবরের সূত্র:http://bit.ly/2e8x1d4

No comments