‘সাম্প্রদায়িকতা’ : বর্তমান মুসলিম জাতির একমাত্র মুক্তির পথ
‘সম্প্রদায়’ শব্দ থেকে আগত শব্দ হচ্ছে ‘সাম্প্রদায়িক’। যে ব্যক্তি নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করে, কথা বলে, দাবি তুলে তাকে সাম্প্রদায়িক বলে।ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে আমরা বহুমূখী সাম্প্রদায়িক আচরণ করি। যেমন ধরুন-
১) কোন ব্যক্তির সামনে তার বাবার বিরুদ্ধে গালি দেয়া হলো। এতে ঐ বক্তি তীব্র প্রতিবাদ জানালো। এক্ষেত্রে প্রতিবাদকারী ব্যক্তি পারিবারিক বা বংশগত সাম্প্রদায়িক।
২) ঢাকা কলেজের একজন ছাত্র গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে। এতে কলেজের সমস্ত ছাত্র রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলো, যান চলাচল বন্ধ করে দিলো। এক্ষেত্রে ঢাকা কলেজের সমস্ত ছাত্র তার কলেজের পক্ষে সাম্প্রদায়িক। আবার ঢাকা কলেজের কোন ১টি ব্যাচের ছাত্ররা ভিসির কাছে ক্লাসের ব্যাপারে কোন দাবি তুলে ধরলো। এতে বলা যায়- ঐ ব্যাচের ছাত্রগুলো ব্যাচের পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক।
৩) ৫২ সালে ভাষা আ্ন্দোলন যারা করেছে, তাদেরকে বলা যেতে পারে বাঙালী সাম্প্রদায়িক। কিংবা যারা ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছে তাদের বলা যায়, পূর্ব বাংলার স্বার্থ রক্ষায় সাম্প্রদায়িক। একইভাবে একটি দেশের জাতীয়তাবাদ ঐ দেশের সমস্ত লোকগুলোর সাম্প্রদায়িকতার যোগফল। কোন জাতির মুক্তি সংগ্রাম কখনই সম্ভব নয়, যতক্ষণ সে নিজ জাতির পক্ষে সাম্প্রদায়িক না হয়।
৪) নাস্তিকরা বিভিন্ন সময় রাস্তায় যে মিছিল/মিটিং করে সেটাও সাম্প্রদায়িকতা, কারণ সেটার মাধ্যমে তারা নিজ নাস্তিক সম্প্রদায়ের পক্ষে দাবি-দাওয়া তুলে।
বর্তমান কালে ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দটাকে যারা খারাপভাবে তুলে ধরে তারা আসলে সাম্প্রদায়িকতা বলতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে বোঝাতে চায়। তাদের মতে সব সাম্প্রদায়িকতা ভালো, কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা খারাপ। আরো স্পষ্ট করে বলতে- ‘ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা’ বলতে তারা শুধু ‘মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা’কেই ইনডিকেট করে। মানে কেউ যদি মুসলমান হয়ে কোন দাবি তুলে, তবে তারা সেখানে বাধা দেয়। অথচ হিন্দুরা যখন নিজের সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বলে দাবি তুলে, তখন সেটাকে তারা সাম্প্রদায়িকতা বলে না। বৌদ্ধরা যখন নিজের সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বলে তখন সেটাকে তারা সাম্প্রদায়িকতা বলে না, খ্রিস্টানরা যখন নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষে বলে তখন সেটাকে তারা সাম্প্রদায়িকতা বলে না। কিন্তু একজন মুসলমান যখন নিজ সম্প্রদায়ের কথা বলে, তখনই তাকে সাম্প্রদায়িক বলে হেয় করা হয়। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যারা ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটা প্রচারকারীরা আসলে ইসলাম বা মুসলিম বিদ্বেষী।
সম্প্রতি আমার বিরুদ্ধে এক লেখায় পিনাকী ভট্টাচার্য বলেছে
“সামনের দিনগুলোতে এগুতে হলে এই ভূখণ্ডের সকল মানুষকে তার ধর্ম বর্ণ জাত পরিচয় থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী বা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। সে তার সমস্যায় তার সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে নয় বরং একটা একক পলিটিক্যাল কমিউনিটির সদস্য হিসেবে সে তার মতামত রাখবে। এখন যদি একজন হিন্দু বা মুসলমান তার হিন্দু বা মুসলমান পরিচয়ে হিন্দুস্বার্থ অথবা মুসলমানস্বার্থ বলে তার সমস্যাকে উত্থাপন করে আর হিন্দু বা মুসলমান কায়দায় সেই সমস্যার সমাধান দাবী করে তাহলে এটা বিভেদাত্মক বা যেটাকে আমরা প্রচলিত অর্থে সাম্প্রদায়িক বলি।”
তারমানে কোন মুসলমান তার দাবি দাওয়া তুললেই তাকে সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দেয়া হবে। হিন্দু করলে ট্যাগ দেয়া হবে না। কারণ প্রতিদিন হিন্দুরা অসংখ্য সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে, এমনকি পূজা উপলক্ষে পিনাকী নিজেও শার্ট ভিক্ষা শুরু করেছে, সেটাকে তো সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। বলতে হবে কোন মুসলমান কিছু চাইলে।
আসলে সম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক বিশেষনটাই বর্তমান বিশ্বের কী-পয়েন্ট। যারা সাম্প্রদায়িক (মানে নিজ সম্প্রদায়ের লোকজন একত্র হয়ে কমিউনিটি তৈরী করে দাবি তোলা) হতে পেরেছে তারাই বর্তমান বিশ্বে সফলতা লাভ করেছে করেছে। আর যারা সাম্প্রদায়িক হতে পারেনি (মানে নিজ সম্প্রদায়ের লোকজন একত্র হয়ে কমিউনিটি তৈরী করে দাবি তুলতে পারেনি) তারা সফল হতে পারেনি। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র বলেন আর বিশ্বযন্ত্র বলেন- কেউই কোটি কোটি দলছাড়া বিচ্ছিন্ন মানুষকে পাত্তা দেয় না। কিন্তু ১০টা লোক একত্র হয়ে কমিউনিটি তৈরী করে দাবি তুলুক, তাকে সবাই পাত্তা দিবে, তার কথা শুনবে। বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দুরা হঠাৎ করে প্রভাব বিস্তার কারণ কারণ কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক কমিউনিটি তৈরী করা। এরা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু মহাজোট, ইসকন ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক সংগঠন তৈরী করে নিজ সম্প্রদায়ের লোকগুলোকে একত্র করেছে এবং তাদের সম্প্রদায়ের পক্ষে এবং অন্য সম্প্রদায়ের বিপক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু মুসলমানরা সেটা করেনি। এর কারণ মুসলমানদের মনে সাম্প্রদায়িক মানে নিজ জাতির লোকগুলোকে একত্র করে সম্প্রদায়ের পক্ষে বলার মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে শুধু মুসলমানদেরকে টার্গেট করে নেগেটিভভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দৃশ্যত বিষয়টা খুব ছোট, কিন্তু বাস্তবে সারা বিশ্বে মুসলমানদের কোনঠাসা করার প্রধান কী-পয়েন্ট। তাই মুসলমানরা যতক্ষণ পর্যণ্ত সাম্প্রদায়িক না হতে পারবে, ততক্ষণ মুসলমানদের মুক্তি নাই।
No comments