হাওরের মাছের মড়ক নিয়ে এক প্রত্যক্ষদর্শী কৃষকের জবানবন্দি
হাওরে মাছের মড়ক নিয়ে অনেক মিডিয়া অনেক ধরনের খবর দিচ্ছে, অনেকে অনেক মন্তব্য করেছে, অনেকে অনেক কিছু আশঙ্কাও করছে। কিন্তু ঐ সময় আসলেই কি ঘটেছিলো তার কোন স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়না। আমি এমনই কিছু খুজছিলাম। গতকাল অনলাইন চ্যাটে এক বন্ধু এক কৃষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো যে, ঐ সময় হাওর অঞ্চলে অবস্থান করছিলো। তার থেকে অনেকগুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, আমি সেগুলো আপনাদের জন্য শেয়ার করছি-
১) আমার প্রশ্ন : আপনার বাসা কোথায় ?
কৃষকের উত্তর : আমার বাসা সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশায়, তবে গ্রামের নাম বলতে চাচ্ছি না।
২) আপার প্রশ্ন : আপনার পেশা কি ?
কৃষকের উত্তর : আমি কৃষক, আমার বাবাও কৃষক, আমরা পারিবারিকভাবে ধান চাষ করি।
৩) আমার প্রশ্ন : কি ধান চাষ করেন ?
কৃষকের উত্তর : ইরি ২৮ ও ২৯
৪) আমার প্রশ্ন : ফলন কেমন ?
কৃষকের উত্তর : ভালো । এক কেয়ারে (৩২ শতাংশ) ২০ থেকে ২২ মন হয়।
৫) আমার প্রশ্ন : আগে থেকেই ইরি ২৮-২৯ করতেন নাকি নতুন ?
কৃষকের উত্তর : গত কয়েক বছর ধরে। আগে বোরো বা শাহী ধান চাষ করতাম, সেটাতে এক কেয়ারে ৮/১০ মন পেতাম। এখন ইরি ২৮/২৯ করে ভালো ফলন পাই।
৬) আমার প্রশ্ন : কেমন সময় লাগে ?
কৃষকের উত্তর : পৌষ-মাঘে বীজ বপন করি, আর চৈত্র ২০ থেকে বৈশাখের ১৫ এর মধ্যে কাটা শেষ হয়।
৭) আমার প্রশ্ন : বন্যার পানি সাধারণত কখন আসে ? আর এবার কখন এসেছে ?
কৃষকের উত্তর : সাধারণত আসে জৈষ্ঠ্য এর মাঝামাঝি, তবে এবার চৈত্রের মাঝামাঝি চলে এসেছে।
৮) আমার প্রশ্ন : শেষ কবে আপনারদের ফসল নষ্ট হয়েছে ?
কৃষকের উত্তর : গত বছরই নষ্ট হয়েছে। পর পর দু বছর বন্যায় ফসল নষ্ট হলো।
৯) আমার প্রশ্ন : আপনাদের হাওর ভারতীয় সীমানা থেকে কতদূরে ?
কৃষকের উত্তর : আনুমানিক ১৩-১৫ কিলো হবে ।
১০) আমার প্রশ্ন : এ বছর কিভাবে পানি আসলো ? বলবেন একটু …
কৃষকের উত্তর : এ বছর খুব দ্রুত পানি এসেছে। এভাবে পানি আসা আমরা আগে কখন দেখি নাই। ২৪ ঘন্টা আগে যে হাওর পায়ে চলাচলের রাস্তা ছিলো, ২৪ ঘন্টা পর সেখানে ট্রলার চলছে। পানি ধানের মাথার ২-৩ হাত উপর দিয়ে গেছে।
১১) আমার প্রশ্ন : বন্যা আসলেই কি ফসল নষ্ট হয়ে যায় ?
কৃষকের উত্তর : সব সময় না। পানি যদি অল্প থাকে তবে সিস্টেম করে ধান কাটা যায়। সব অবশ্য কাটা যায় না। নৌকা দিয়ে কিছু কাটা যায়, এতে সারা বছরের খোরাকি অন্তত উঠে আসে।
১২) আমার প্রশ্ন : এবার কি ধান কাটা সম্ভব ?
কৃষকের উত্তর : না। এবার পানি বেশি।
১৩) আমার প্রশ্ন : বন্যা কেন আসলো ? বাধ পুননির্মাণ না করার কারণে ? মিডিয়ায় দেখলাম সেখানে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে ?
কৃষকের উত্তর : সঠিক। দুর্নীতি হয়েছে । অনেক এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়্যারম্যান পাবলিকের মাইর পর্যন্ত খাইছে। আমরা অনেক আগে থেকেই জানি বাধে লুটপাট হইছে।
১৪) আমার প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয়, বাধ নির্মাণ করলে হাওরের ফসল বাচানো সম্ভব ছিলো ?
কৃষকের উত্তর : আমার মনে হয় না। দুর্নীতি হইছে এটা ঠিক। কিন্তু বাধ পুননির্মাণ করলে ফসল বাচানো সম্ভব ছিলো, এটা সঠিক না। কারণ আমি নিজের চোখে দেখেছি, পানি বাধের অনেক উপরে ছিলো। নদী উপচে পানি পড়েছে, বাধ দিয়ে এত বড় নদীর পানি আটকানো যায় না।
১৫) আমার প্রশ্ন : পানির এত উচ্চতা কেন ?
কৃষকের উত্তর : ভারতীয় ঢল। ভারতীয় অস্বাভাবিক ঢলের কারণে এবার বন্যা হইছে ?
১৬) আমার প্রশ্ন : হাওরে মাছ আসলো কোথা থেকে ?
কৃষকের উত্তর : আসলে যে হাওরে ধানক্ষেত সেখানে মাছ থাকে না, কারণ শুষ্ক মৌসুমে সমস্ত হাওর সেচ করা হয়। কিন্তু কোন কোন হাওরে বা বিলে মাছের চাষ করা, বন্যা আসলে সব একাকার হয়ে যায়, ফলে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। মাছের পরিমাণ এতই বেশি যে অনেক কৃষক ধান হারালেও মাছ ধরে কিছুটা হলেও সান্তনা পায়। কিন্তু এবার সব গেছে ?
১৭) আমার প্রশ্ন : সব গেছে কেন ?
কৃষকের উত্তর : দূষণের কারণে, আমাদের এলাকার সিভিল সার্জন বলে দিছে এই মাছ মারাত্মক বিষাক্ত, আমাদের এলাকায় এ মাছ না ধরতে বা বিক্রি না করতে মাইকিং করা হয়।
১৮) আমার প্রশ্ন : কিভাবে দূষনের সূত্রপাত, বিস্তারিত বলেন।
কৃষকের উত্তর : যখন পানি বাড়লো, পানিতে সব কিছু একাকার, তখন পানি ছিলো স্বচ্ছ। অনেক মাছ আমাদের বাড়ির কাছেই ছিলো। আমি মাছ ধরে বিক্রি করেছি। কিন্তু পানি বাড়ার দুইদিন পর হঠাত ঝড় হলো।
১৯) আমার প্রশ্ন : সময়টা কখন ?
কৃষকের উত্তর : আনুমানিক চৈত্রের ২১ বা ২২ তারিখ।
২০) আমার প্রশ্ন : কি হলো ?
কৃষকের উত্তর : একদিন রাতে প্রচণ্ড ঝড় হলো। ঝড়ের পর আমরা বাতাসে তীব্র একটা ঝাঝালো গন্ধ পেলাম। গন্ধটা কেমিকেল টাইপের গন্ধ। গন্ধ এত তীব্র হতে থাকলো যে অনেকে বমি পর্যন্ত করতে থাকলো। মাথা ঘুরতে থাকলো। রাতের বেলায় দেখলাম, অসংখ্য মাছ আমাদের বাসার তীরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এরপর সকাল বেলায় দেখলাম স্বচ্ছ পানি লাল বর্ণ ধারণ করেছে।
২১) আমার প্রশ্ন : কেমন লাল ?
কৃষকের উত্তর : ইটের গুড়া পানিতে মেশালে যেমন হয়, গরুর রক্ত পানিতে মেশালে যেমন হয় তেমন।
(আমি তাকে acid mine drainage দূষণের কিছু ছবি দেখলাম। সে বললো, ঠিক এ ধরনের রং।)
২২) আমার প্রশ্ন : মিডিয়ায় দেখলাম- পানির রং নাকি সবুজ হইছিলো ?
কৃষকের উত্তর : না ভুল। পানির রং ইটের গুড়া পানিতে মেশালে যেমন হয় তেমন লাল হয়েছিলো।
২৩) আমার প্রশ্ন : এটা কি শুধু আপনাদের বাসার সামনের হাওরেই হয়েছিলো, নাকি অন্য হাওরগুলোতেই হয়েছিলো ?
কৃষকের উত্তর : না । আমি ফোন করে অন্যান্য যায়গায় খবর নিয়েছি, অন্য হাওরগুলোর পানির রং এরকম হয়েছিলো।
২৪) আমার প্রশ্ন : এরপর কি দেখলেন ?
কৃষকের উত্তর : প্রথমে ছোট ছোট পোনা মাছগুলো মরা শুরু করে, ১ দিনের মধ্যে বড় মাছ। বিলের নিচে পানির মধ্যে লাল রং এর একধরনের মাছ লুকিয়ে থাকে, যেগুলো সহজে শিকার করা যায় না। ঐগুলো পযন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মরে ভেসে উঠলো।
২৫) আমার প্রশ্ন : কত মাছ হবে ?
কৃষকের উত্তর : অনেক মাছ, অনেক। সব মাছ মারা গেছে, ১টাও নাই।
২৬) আমার প্রশ্ন : খবরে দেখলাম হাস মরেছে, গরু মরেছে, মহিষ মরেছে ?
কৃষকের উত্তর : আমি বলতে পারবো না, আমাদের এলাকায় হয় নাই।
২৭) আমার প্রশ্ন : মিডিয়ায় দেখলাম, ধান পচে পানি দূষিত হয়েছে ? এটা কতটুকু সত্য ?
কৃষকের উত্তর : এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। ধান পচে এভাবে পানি দূষণ হয় না। আর ধান পচতে সময় লাগে। ১-২ দিনের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটা সম্ভব না।
২৮) আমার প্রশ্ন : তাহলে কি কিটনাশকের কারছে এমনটা ঘটতে পারে ? মিডিয়ায় এমনটা অনেকে দাবি করেছে?
কৃষকের উত্তর : না কিটনাশকের কারণেও এমনটা ঘটনার সম্ভব নাই। অন্তত পানি এ ধরনের লালচে হবে না।
২৯) আমার প্রশ্ন : এখনও কি পানি লালচে আছে ?
কৃষকের উত্তর : না, ২ দিনের মধ্যে পানির লালচে বর্ণ দূর হয়ে যায়। পানির প্রবাহে পানি আবার সাদা হয়ে গেছে।
৩০) আমার প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় ভারতীয় ঢলের মাধ্যমে ক্ষতিকারক কিছু ভেসে এসেছে ?
কৃষকের উত্তর : হতে পারে, কারণ এ ধরনের বিষাক্ত কেমিকেল টাইপের গন্ধ আমরা আগে কখন শুনি নাই। পানিতে এর অস্তিত্ব ছিলো, বাতাসেও ছিলো। আমাদের মধ্যে যারা বয়:বৃদ্ধ আছে তারা বলেছেন- গত ১০০ বছরেও এ ধরনের ঘটনা হাওর অঞ্চলে ঘটে নাই।
শেষ
---------------------------------------------------
--আমার ফেসবুক পেইজ Noyon Chatterjee 5
(https://www.facebook.com/noyonchatterjee5),
--পেইজ কোড- 249163178818686 ।
(https://www.facebook.com/noyonchatterjee5),
--পেইজ কোড- 249163178818686 ।
--আমার ব্যাকআপ পেইজ- Noyon Chatterjee 6 (https://www.facebook.com/202647270140320/)

No comments